
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়েই দালালচক্রের প্রলোভনে ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারা বাজার উপজেলার একদল তরুণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হয়নি—উত্তাল ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে নির্মমভাবে থেমে গেছে তাদের জীবনের গল্প।
লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ঝুঁকিপূর্ণ রাবার বোটে করে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও অমানবিক পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ জন যুবকের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের অদূরে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। গ্রিক কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের ভাষ্য থেকে জানা যায়, নৌকাটিতে থাকা অন্তত ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) এই হৃদয়বিদারক সংবাদ এলাকায় পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো অঞ্চলে।
নিহতদের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন হলেন,পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁওয়ের শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁওয়ের মো. আলী, বাউরি গ্রামের সুহানুর এবং পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের নাঈম। আমিনুর রহমান রেখে গেছেন স্ত্রী ও পাঁচ বছরের কন্যা রাইসা আফরিন মাহাকে।
দিরাই উপজেলার চারজন হলেন,জাহানপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০), তারাপাশা গ্রামের মো. সাহান (৩৩), সাজিদুর রহমান (২৮) এবং নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০)—এই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া করিমপুর ইউনিয়নের তারেক (২২) এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
দোয়ারা বাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের পানাইল গ্রামের ফাহিম (২২)-এর মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত হয়েছে। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক দালালচক্র। স্থানীয়ভাবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের নাম সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রিসে অবস্থানরত বিল্লাল বিদেশ থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন, আর দেশে থেকে দুলাল মিয়া সহজ-সরল যুবকদের ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনুর রহমান ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে এই পথে যাত্রা শুরু করেন। তিন দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর আশ্বাস দিলেও তাকে প্রায় তিন মাস লিবিয়ার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।
জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, বড় জাহাজের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট প্লাস্টিক ও রাবারের বোটে তুলে দেওয়া হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে টানা ছয় দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে একে একে প্রাণ হারান অনেকে। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়।
এঘটনায় জড়িত সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারার এই তরুণদের অকাল মৃত্যুতে পুরো সুনামগঞ্জ জেলায় শোকের মাতম বিরাজ করছে। এলাকাবাসী দালাল সিন্ডিকেটের মূল হোতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।