
বিশেষ প্রতিবেদক
সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন সিলেট মহানগর যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. উসমান গনি জানু, সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক আজিজ খান সজিব ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য গোলাম রব্বানী! এ ঘটনায় সিলেট বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ইমদাদ হোসেন চৌধুরী নিজের গ্রুপ ভারী করতে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রকৃত ঘটনার কোনো তদন্ত না করে, একটি পক্ষের হয়ে নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার ২৯ রমজান রাতে সিলেটের মদিনা মার্কেটে অতিরিক্ত দামে গরুর মাংস বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এর আগে ওইদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে ৪ টার দিকে ওয়ার্ড বিএনপির সহ সভাপতি গিয়াস উদ্দিনের সামনে তার স্ত্রীকে মদিনা মার্কেটের একটি গরুর মাংসের দোকানে অতিরিক্ত দামে মাংস বিক্রির প্রতিবাদ করায় তাকে লাঞ্চিত করে দোকানদার। বিষয়টি দেখে গিয়াস উদ্দিন প্রতিবাদ করলে দোকানদারের পক্ষ হয়ে সিলেট মহানগর যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক রিপন চৌধুরী ও রেজাউল তাদের দলবল নিয়ে গিয়াস উদ্দিনকে তার স্ত্রীর সামনে তাকে মারধর করে। গিয়াস উদ্দিন বিষয়টি অবগত করেন সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক ও মদিনা মার্কেট বাজার কমিটির সদস্য আজিজ খান সজিব, ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমদ খানসহ বিভিন্ন নেতাকর্মীদের। পরে তারা ঘটনাস্থলে এলাকার মুরুব্বিসহ গিয়ে বিষয়টি তারাবিহ নামাজের পর দেখে দিবেন বলে দুই পক্ষকে শান্ত করে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তিতে রাত ৮টার দিকে আবারও তারা উভয় পক্ষের লোকেরা জড়ো হয় মদিনা মার্কেটে। এসময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে মদিনা মার্কেট এলাকায়। এসময় ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমদ খান উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারাবিহ নামাজের পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক ও মদিনা মার্কেট বাজার কমিটির সদস্য আজিজ খান সজিব। তিনিও তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের কথা না শুনে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। এসময় বেশ কয়েকটি গাড়ি, দোকান পাট, বাসা ভাঙ্চুর করা হয়।
ঘটনার পর রাতে ঘটনাস্থলে যান সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ তারই বেশ কয়েকজন কর্মী। পরদিন শুক্রবার (২০ মার্চ) আজিজ খান সজিব ও গোলাম রব্বানীকে বহিস্কারের আদেশ আসে কেন্দ্র থেকে। ওদিন কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিক, দলের দুর্দিনের কর্মীদের বহিষ্কার করায় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে এলাকায় একটি মানববন্ধনের আয়োজন হয়। সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ক্ষমতা অনেক যেনেই সেই মানবন্ধনে সিলেট মহানগর যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. উসমান গনি জানু আজিজ খান সজিব ও গোলাম রব্বানীকে বহিস্কারের আদেশ প্রত্যাহারের দাবি করে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। পরে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২২ মার্চ রোববার রাতে স্বেচ্ছায় মো. উসমান গনি জানু যুবদল থেকে পদত্যাগ করেন। তার এই পদত্যাগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরদিন ২৩ মার্চ সোমবার মো. উসমান গনি জানুও কেন্দ্র থেকে বহিস্কার আদেশ আসে। এছাড়াও ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমদ খানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়। দলের দুর্দিনের নেতাকর্মীদের বহিস্কার আদেশ দেখে পদধারী অনেক নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের মত প্রকাশ করে। টনক নড়ে কেন্দ্রের। গঠন করা হয় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি। এই ঘটনায় পাল্টা-পাল্টি ২টি মামলাও হয়েছে। এরআগে মানবন্ধনে বক্তারা সিলেটের দুই মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে মহানগর বিএনপির একজন সদস্য জানান, মদিনা মার্কেট এলাকায় ঈদের আগের দিন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এটা দু:খজনক। ঘটনার পর সেখানে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী উপস্থিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পক্ষের হয়ে অন্য পক্ষকে দোষারোপ করা ঠিক হয়নি। তার এই দোষারোপ দলকে বদনামি করেছেন সিলেটবাসীর কাছে। তিনি ঘটনাস্থলে সার্টিফিকেট দিয়ে এসেছেন এই ঘটনাটি বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের লোকেরা করেছে। তিনি পারতেন বিষয়টি তদন্ত করার। সেই ক্ষমতা ওনার আছে। এ ঘটনায় সিলেট বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাঁর এসব “কলকাঠি” নাড়ার কারণে দলে আবারও গ্রুপিং রাজনীতি শুরু হতে পারে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন সিলেট সিটি কর্পোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। মো. উসমান গনি জানু, আজিজ খান সজিব, গোলাম রব্বানী ও রাসেল আহমদ খান দীর্ঘদিন থেকে তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী তিনিও সিলেট সিটি কর্পোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী। তিনি অনেকদিন থেকে তাদের তার বলয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তাতে তাদের সাড়া মেলেনি। যে কারণে তাদের উপর ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এত ক্ষোভ। সম্প্রতি ৮নং ওয়ার্ডে আজিজ খান সজিব মহিলা দলের নেতৃবৃন্দের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ করেন। এই ঈদ উপহার বিতরন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। এতে আরো ক্ষিপ্ত হন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। আর এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের বিরুদ্ধে একটি পোস্ট করে। সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থীর পক্ষে কাজ করাই তাদের কাল হয়েছে। ফলসরুপ একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মদিনা মার্কেট বাজার কমিটির সদস্য আজিজ খান সজিব বলেন, ঘটনার সময়ে আমি সেখানে ছিলাম না। তারাবিহ নামাজে ছিলাম। পরে সেখানে যাই। দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করি। আমি সিসিকের ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী। ঘটনার পর সেখানে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ভাই উপস্থিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে দোষারোপ করেন। এমনকি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আমাদের বিরুদ্ধে একটি পোস্ট করেন। আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি। সম্প্রতি (আমরা) যাদের বহিস্কার করা হয়েছে এরই একটি কারন আছে। আসন্ন সিলেট সিটি কর্পোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ভাইয়ের পক্ষে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছি। বিষয়টি ভালো চোখে দেখেন নি ইমদাদ ভাই। তিনি দীর্ঘদিন থেকে আমাদের তার বলয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। আমরা তাতে সাড়া দেই নি। তিনি আমাদের সিনিয়র ভাই। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র তিনি সেই আক্রোশ মিটিয়েছেন আমাদের সাথে। যা বেমানান। একই কথা বলেছেন, গোলাম রব্বানী।
৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল আহমদ খান বলেন, আমি বিষয়টি মিমাংসা করার চেষ্টা করায় আমাকেও শোকজ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্ত করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

মো. উসমান গনি জানু বলেন, কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিক, দলের দুর্দিনের কর্মীদের বহিষ্কার করায় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে এলাকায় একটি মানববন্ধনের আয়োজন হয়। আমি তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। সেকারণে আমাকেও বহিস্কার করা হয়েছে। আমরা সাদাকে সাদা বলবো, কালোকে কালো। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আমি জানতাম ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় আমাকেও বহিস্কার করা হবে। তাই বহিস্কারের একদিন আগেই আমি নিজে দল থেকে অব্যাহতি নিয়েছি। যা সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীরাসহ দলের নেতাকর্মীরা অবগত।
বিষয়টি জানতে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর মুঠোফোনে কল করলে তিনি কল রিসিভ করেন নি।